রমজানের সময় বিশেষ খাদ্যাভ্যাস কেন প্রয়োজন?

প্রায় শেষের দিকে মাহে রমজান। যথারীতি পত্রপত্রিকায় রমজানের বিশেষ খাদ্যাভ্যাস নিয়ে অনেক লেখাই চোখে পড়বে সবার। অনেক কথাই বলা হবে, অনেক উপদেশ দেয়া হবে কিন্তু জানা হবে না কেন ডাক্তাররা এসব কথা বলেন বার বার। আজ সেসব পেছনের কারনগুলো নিয়েই জানবো আমরা।

 

বেশী করে পানি ও শরবত খেতে বলা হয়ঃ

এমনিতেই গরমের সময়ে পড়েছে রোজা তার পরে সারাদিন পানি খাওয়া হয় না। কম পানি পান করলে হজমেও সমস্যা হয়, শরীরের অঙ্গগুলোর কাজ ঠিকমতো চলার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত পানি। দেহের পানির চাহিদা মেটাতে তাই রোজা ভাঙার পরে বেশী করে পানি পান করতেই হবে।

ডাবের পানি খেতে বলা হলেও কার্বোনেটেড বেভারেজ কেন ডাক্তারদের চক্ষুশূলঃ

ডাবের পানিতে আছে বেশ কিছু খনিজ পদার্থ যেগুলো শরীরের জন্য খুব দরকার। রয়েছে পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ক্লোরিন ইত্যাদির লবণ। ডাবের পানি তাই পানির সাথে এসব প্রয়োজনীয় খনিজেরও অভাব পূরণ করে। ডাবের পানির সাথে লবনের অভাব পূরণ করতে খাবার স্যালাইনও পান করতে পারেন।

কোল্ড ড্রিঙ্কস কেনই বা দুচোখের বিষ হবে না? কি না করে এধরণের পানীয়? এসডিটি, বুক জ্বালা, আলসার, কিডনি ও লিভারের ওপরে চাপ দেয়া থেকে শুরু করে আরো বেশ কিছু ক্ষতিকারক দিক রয়েছে এদের।

 

ভাজা পোড়া খেতে কেন মানা করা হয়ঃ

রোজা রেখে এমনিতেই হজম শক্তি থাকে দুর্বল, তার ওপরে তেলে ভাজা জিনিস বেশী খেলে ঝামেলা হবেই। বদহজমের বিপদ আছে, আছে এসিডিটি বাড়ার সুযোগ। তেল, চর্বি এসিডিটি বাড়ায়। বাইরের কেনা খাবার আরো বিপদজনক। এক তেল দিয়ে বার বার ভাজে। এতে দেহে প্রবেশ করে ক্ষতিকর তেলজাত পদার্থ, সাথে বুকজ্বালা ফ্রি।

 

রমজানে আঁশযুক্ত খাবার বেশী খেতে বলার যুক্তি কিঃ

আঁশযুক্ত খাবার পেটে থাকে অনেকক্ষণ, হজম হতে দেরি হয়। তাই ক্ষুধা লাগেও দেরিতে। ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখতেও এগুলো সাহায্য করে। সেহেরির সময় এসব আঁশ জাতীয় খাবার খাবেন বেশী করে।

তাছাড়া রমজানে অনেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় পড়েন। তাদের জন্য আঁশযুক্ত খাবার খুব দরকার। বেশী করে পানি, খাবার বেশী আঁশ, মাঝে মাঝে ইসবগুলের ভুশি খেলে ডাক্তাররের কাছে আর দৌড়াতে হবে না সহজে।

 

একবারে বেশী করে খাবার খেতে মানা করার কারণ কিঃ

ইফতারির সময় আজানের শব্দ শুনেই হাপুস হুপুস খেয়ে দ্রুত পেটে ভরানো চলবে না। খেতে হবে অল্প করে সময় নিয়ে। সারাদিন খালি পেটে থাকার পরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা থাকে খুব কম। ইফতারিতে দ্রুত খাবার খেতে থাকলে হঠাৎ করে অতিরিক্ত খাবারের কারনে রক্তে নিঃসৃত ইনসুলিনের কারনে রক্তে থাকা অবশিষ্ট গ্লুকোজও শেষ হয়ে যায়, যার ফলে আমরা খুব ক্লান্তি বোধ করি একসাথে বেশী খেয়ে ফেললে।

ইফতারিতে মিস্টি জাতীয় খাবার বেশী খেতে বলা হয়ে কেনঃ

সারাদিন না খাওয়ার পরে শরীর কম সময়ের মাঝেই শক্তি খোঁজে। ইফতারিতে খেজুর থাকেই। খেজুরের গ্লুকোজ খুব দ্রুত শরীরে শোষিত হয়ে দেহে শক্তি যোগায়। অন্যান্য মিস্টি যেমন জিলাপিও শক্তি দেয় খুব কম সময়ের মাঝে।

 

ইফতারিতে বেশী করে ফল রাখতে বলার কারণ কিঃ

মিস্টি ফলে রয়েছে ফ্রুক্টোজ যা শক্তি দেয়। রয়েছে বিভিন্ন খনিজ যা দেহের জন্য অনেক প্রয়োজনীয়। ফল খেলে শরীরে যাচ্ছে ভিটামিন, শক্তি, খনিজ পদার্থ, আঁশবার ফাইবার ইত্যাদি।

পেপে, কলা, আম যে ফলই খান না কেন সবগুলোই কোষ্ঠবদ্ধতা সারাতে খুব ভালো কাজ করে। তাই সাধ্যের মধ্যে বেশী করে ফল খাবেন।

 

চিড়া, দই খান অনেকেঃ

ইফতারির পরে অনেকেই এটা খেয়ে থাকেন। পেট রাখে ঠাণ্ডা, দ্রুত সহজে হজম হয়। চিড়ার রয়েছে এসিডিটি কমানোর ক্ষমতা, দই পরিপাক হয় খুব সহজেই। তাই চিড়া, কলা, দই ভালো একটা মেনু।

 

হালিম খেলে কেমন হয়ঃ

হালিম খুব ভালো একটি খাবার যা আমিষের চাহিদা মেটাবে। তবে নানা রকম ডাল দিয়ে রান্না হয় এবং মশলার ব্যবহার ও বেশী হয়ে গেলে সেটা হজমে ঝামেলা করতে পারে। বুঝেশুনে, নিজের অবস্থা বুঝে খেতে পারেন।

 

ছোলা-মুড়ি না খেলে যে ভালো লাগে নাঃ

ছোলা-মুড়ি খাবেন না কেন? অবশ্যই খাবেন তবে ছোলাতে বেশী মশলার ব্যবহার একে গুরুপাক করে দিতে পারে। মুড়িতে কোন আপত্তি নেই, এটা বুক জ্বালা, এসিডিটি কমায়।

 

মাংসের বিভিন্ন মেনু দেখলে মন মানে না, কি করবোঃ

উপাদেয় খাবার দেখলে খেতে ইচ্ছে করবেই, এটাই স্বাভাবিক। এসব খাবারে মশলা, তেলের পরিমাণ বেশী থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। বাসায় একবেলা মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন, আরেক বেলা না হয় মাংস খেলেন। খাবারে ভেরিয়েশন না আনলে রোজায় রুচি থাকবে না।

 

ডিম ও দুধের ব্যাপারে কি হবেঃ

দুধের ব্যাপারে কোন বিধিনিষেধ নেই। সেহেরীতে দুধ খেয়ে থাকেন প্রায় সবাই। সারাদিনের উপোষের পরে দুধ শরীরের ক্ষয় পূরণে অনেক সাহায্য করে। যাদের বয়স হয়েছে, রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশী তারা কুসুম ছাড়া ডিমের সাদা অংশ খেতে পারেন, সমস্যা নেই।

 

রকমারি খাবারের ভিড়ে রসনা তৃপ্তির সাথে শরীরের দিকে খেয়াল রাখা হয়তো খুব কঠিন মনে হতে পারে তবে বাস্তবে এটা তেমন কঠিন কিছু নয়। খেতে হবে নিজের শরীর বুঝে, খাবারের মান বুঝে। এই রমজানে সকলে থাকুন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, এই কামনায়। ঈদ মোবারক।

 

 

 


ডা. রায়হান কবীর খান

 

 

Please Share:

Related posts

Leave a Comment