বিশেষ স্বাক্ষাৎকার – অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ

 

বাংলাদেশের নিউরোমেডিসিনের প্রাণপুরুষ ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদ কথা বলেছেন সাস্থ্যবাংলার সাথে। একান্ত ঘরোয়া আলোচনায় উঠে এসেছে শৈশব থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত তার জীবনের নানা কথা। সেসব কথা নিয়েই এবারের সাক্ষাৎকার পর্বের আয়োজনঃ

সাস্থ্যবাংলাঃ স্যার সাস্থ্যবাংলার পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। আপনার শৈশব নিয়ে কিছু বলুন

ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদঃ ধন্যবাদ।

ফরিদপুরের লক্ষ্মীপুর গ্রামে আমার জন্ম। আমার বাবা মরহুম কাজী মো: আব্দুর রউফ এবং  মা মরহুম তহুরন আরা বেগম

জন্ম ও বেড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুরেই।

শৈশবে আমি অনেক দুরন্ত ছিলাম। দুপুরে খাবারের পরে ৫-৭ জন বন্ধু মিলে দূরের বাড়ীগুলোর আম, কাঁঠাল, বড়ই লুকিয়ে পাড়ার জন্য বের হতাম। মাকে ভয় পেতাম তাই কাছে না গিয়ে বাড়ি হতে দূরে যেতাম।

আমার অনেক মার্বেল ছিলো, প্রায় ৫০০-৭০০ মার্বেল কৌটা ভরা ছিলো। ছুটির দিনে সবাই মিলে মার্বেল খেলতাম।

এখন মনে হয় সেসময় আমি অনেক বাঁধনহারা আনন্দময় জীবন যাপন করেছি।

সাস্থ্যবাংলাঃ পড়াশোনা কোথায় করেছেন?

ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদঃ আমার স্কুল ছিল ফরিদপুর জিলা স্কুল এবং কলেজ রাজেন্দ্র কলেজ। স্কুলে পড়াশুনার প্রতি তেমন মনযোগী না হলেও পরীক্ষার ফলাফলে আমি বরাবর ১ বা ২ এর মাঝেই থাকতাম। রাজেন্দ্র কলেজের বিশাল পরিসরে গিয়ে নানা ধরনের শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে প্রথম আমার মাঝে একধরনের স্পৃহা তৈরি হল পড়াশুনার প্রতি। এরপরে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। আমি কে-৩০ ব্যাচের ছাত্র। স্বাধীনতার পরে আমরাই ঢাকা মেডিকেলের প্রথম ব্যাচ। সেসময় ৩৩ হাজার আবেদনের মাঝে প্রথম ২০০ জন ঢাকা মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলো। আমি ৩৬ তম হয়েছিলাম।

ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র হিসেবে এরপরে পড়াশুনা শেষে আমি ১৯৭৮ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করি।

সাস্থ্যবাংলাঃ নিউরোলোজির একজন প্রাণপুরুষ হিসেবে বাংলাদেশের নিউরোমেডিসিনের অগ্রগতি নিয়ে আপনার মতামত

ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদঃ বাংলাদেশে নিউরোমেডিসিনের যাত্রা প্রধানত স্বাধীনতার পরেই শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে এর যাত্রা প্রোফেসর এম এ মান্নান স্যারের হাত ধরে শুরু হয় তৎকালীন আইপিজিএমআর(বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি) এ। সেসময় হাতেগোনা কয়েকজন নিউরোলজিস্ট ছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৮৪ সালে প্রোফেসর মান্নান স্যার, প্রোফেসর আনিসুল হক ও আমি সহ মাত্র তিনজন নিউরোলজিস্ট ছিলাম সমগ্র বাংলাদেশে।

১৯৯৪ সালে আমি নিজ উদ্যোগে দেশে আরো ১৬ টি পোস্ট বৃদ্ধি করি। সরকারী বেসরকারি মিলিয়ে এখন প্রায় ১০০ জন নিউরোলজিস্ট আছেন সারা বাংলাদেশে।

এখন বেশিরভাগ পুরাতন মেডিকেল কলেজগুলোতে নিউরোমেডিসিনে এমডি কোর্স চালু হয়েছে। ঢাকার আগারগাওয়ে ন্যাশনাল ইন্সিটিউট অফ নিউরোসাইন্স নামে একটি ৩০০ বেডের বিশেষায়িত হসপিটালের নির্মান শেষ হয়েছে যেটি বর্তমানে উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে। এই হসপিটাল দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় মাইলফলক বলে আমি মনে করি।

সাস্থ্যবাংলাঃ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়ে আপনার স্বপ্ন কি?

ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদঃ এদেশে এখনো মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা অনেক কম। মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করতে চাই। আরো চাই স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রিকরণ অর্থাৎ সর্বস্তরে স্বাস্থ্যসেবা ছড়িয়ে দিতে কাজ করতে চাই।

ব্যক্তিগতভাবে আমি আরো মনে করি পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা উচিত। দেশের সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার করার জন্য বাধ্যতামূলক জন্মনিয়ন্ত্রন আরোপের ব্যাপারে আলোচনার দরকার আছে বলে আমি মনে করি।

দেশের মেধাগুলো যেন সুযোগের অভাবে দেশের বাইরে চলে না যায় আর যারা দেশে থাকছে তাদের মেধা যেন সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় আমি সেটা নিয়েও কাজ করতে চাই। তাদের জন্য আরো বেশি করে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই।

সাস্থ্যবাংলাঃ নবীন ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে আপনি কি উপদেশ রাখবেন?

ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদঃ ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আমার উপদেশ থাকবে পড়াশোনার জন্য মেডিকেলে এসেছ, মন দিয়ে পড়াশোনা করবে।

নবীন ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে বলবো তোমার রোগীর কোন অপরাধ নেই। হসপিটালের কোনো সমস্যায় তোমার রোগী যেন কখনো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে সবসময় খেয়াল রাখবে।

সাস্থ্যবাংলাঃ দেশের ইন্টারনেট ভিত্তিক মেডিকেল সেবার ব্যাপারে আপনার কি অভিমত?

ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদঃ তাৎক্ষণিক সেবা বা সাধারন স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য এটা একটা ভালো উদ্যোগ বলে আমি মনে করি তবে সামগ্রিক চিকিৎসাসেবার জন্য সরাসরি রোগীর সাথে সাক্ষাতের কোন বিকল্প নেই। ইন্টারনেট ভিত্তিক নতুন ধরনের এই সেবা মানুষের আরো উপকারে আসুক এই কামনা করি।

সাস্থ্যবাংলাঃ আপনার মূল্যবান সময় থেকে সাস্থ্যবাংলাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদঃ সাস্থ্যবাংলাকেও অনেক ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণেঃ ডাঃ মোঃ রায়হান কবীর খান

২৯/০২/২০১২ তারিখে গ্রহণকৃত

 

Leave a Comment