গল্পে গল্পে ডায়াবেটিস – ডা. মোঃ এজাজ বারী চৌধুরী

গল্পে গল্পে ডায়াবেটিস 

[ডা. মোঃ এজাজ বারী চৌধুরী] 

ডায়াবেটিস মানে রক্তে সুগার বেশী৷ কি সমস্যা হয়, রক্তে সুগার বেড়ে গেলে? আর কেনই বা এই সুগার বাড়ে? কোথা থেকে আসে এই সুগার? সুস্থ মানুষের রক্তে এই অতিরিক্ত সুগার থাকে না কেন?

আমাদের শরীর কোটি কোটি কোষ দিয়ে তৈরী এবং স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য, প্রত্যেকটি কোষেরই খাবার প্রয়োজন হয়৷ আমরা মুখে যা-ই খাই না কেন, হজম হয়ে সেগুলো এই সুগার তৈরী করে, যা সকল কোষের জন্যই আদর্শ খাবার৷ কিন্তু কোষগুলোর দেয়াল চর্বি দিয়ে তৈরী, আর চিনি তো তেলে মেশানো যায়না! সুতরাং ব্যতিক্রমী কিছু কোষ ছাড়া, বেশীরভাগ কোষই রক্ত থেকে সরাসরি তাদের খাবার, এই সুগারকে গ্রহন করতে পারেনা৷ কোষগুলোর দেয়ালে একটি দরজা থাকে, যেটা আবার লক করা থাকে৷ ইনসুলিন হলো সেই লকের চাবি৷ ইনসুলিন এসে, দরজা খুলে দিলেই কেবল — কোষগুলোতে রক্ত থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সুগার প্রবেশ করে৷ ফলে কোষগুলোও খাবার পায়, আবার রক্তেও অতিরিক্ত সুগারের জটলা থাকে না!

রাস্তার জ্যামের কথা চিন্তা করুন৷ কখন জ্যাম লাগে — যখন গাড়ীগুলো তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনা এবং সব রাস্তাতেই আটকে থাকে… সেটাই তো জ্যাম! একই রকমভাবে, ডায়াবেটিস হলো রক্তে সুগারের জ্যাম, কেননা সুগারগুলো তাদের গন্তব্য, “কোষে” পৌঁছাতে পারছে না!

॥ ২ ॥

রক্তে বেশী সুগার থাকা মানেই হলো, আমাদের শরীরের কোষগুলি তাদের খাবার ঠিকমতো নিতে পারছেনা এবং তারা ক্ষুধার্ত আছে৷ সুতরাং শরীরে দূর্বলতা বোধ হয় এবং কোষগুলোর ক্ষুধার হাহাকারে মস্তিস্ক “পেটের ক্ষুধা” আরো বাড়িয়ে দেয়, ফলে রোগী বেশী খায়৷ কিন্তু সেই অতিরিক্ত খাবার থেকে তৈরী হওয়া সুগারগুলো… কেবল রক্তে সুগারের জটলাই বাড়ায় — কোষের ক্ষুধা মেটায় না৷

আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা করি৷ কখন আপনি একটি দরজার লক খুলতে পারবেন না? ১) যখন চাবি হারিয়ে গেছে৷ ২) চাবি আছে, কিন্তু সেটা আঁকা বাঁকা হয়ে গেছে বলে, তালা খুলছে না৷ ৩) তালার চাবি ঢোকানোর মুখটি কোন কিছু দিয়ে আটকে আছে — যেজন্য আপনি চাবিই ঢোকাতে পারছেন না৷

ডায়াবেটিস রোগীদের একই সাথে এই তিনটি সমস্যাই থাকে — ইনসুলিনের অভাব, ইনসুলিন রেজিষ্ট্যান্স এবং ইনসুলিন রিসেপ্টর ব্লক৷ তাই ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ এবং ইনসুলিন একসঙ্গে ব্যবহার করতে হয় … রোগীর শরীরের ভেতরের অবস্থা অনুধাবন করে৷

॥ ৩ ॥

আচ্ছা, যদি মাসের পর মাস রক্তের সুগার বেশীই থেকে যায় — তাতে কি সমস্যা? পানি থেকে শরবৎ তো কিছুটা ঘন তাইনা? তাহলে বেশী সুগার রক্তের ঘনত্বকেও কিছুটা বাড়িয়ে দেবে৷ আমাদের শরীরে এমন সূক্ষ্ম শিরা উপশিরাও আছে, যেগুলোকে খালি চোখে দেখা পর্যন্ত যায়না! এইসব সূক্ষ্ম রক্তনালী দিয়ে দিনে গড়ে এক লক্ষ পনের হাজার বার রক্ত চলাচল করে — আর মাসে প্রায় সাড়ে চৌত্রিশ লক্ষ বার! আমাদের পানির লাইনে যদি একমাস ধরে টানা ময়লা পানি আসে — তাহলে কত শক্ত মোটা পাইপের ভেতরেও আস্তরণ পড়ে … ব্লক হয়! তাহলে ভেবে দেখুন, আমাদের দেহের অতি সূক্ষ্ম রক্তনালী গুলোর কি অবস্থা হতে পারে?! সেগুলো ব্লক হওয়া শুরু হয় এবং যেই কোষগুলোকে তারা রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে আসছিলো — সেগুলো আস্তে আস্তে মরে যেতে শুরু করে৷ এজন্যই মস্তিস্ক, চোঁখ, কিডনী, নার্ভ, হার্ট ইত্যাদির ক্ষয় শুরু হয়!

॥ ৪ ॥

এবার আবার একটু পেছনে ফিরে যাই৷ যাদের ডায়াবেটিস অনেক বেশী অর্থাৎ যাদের কোষগুলো খুব বেশী ক্ষুধার্ত থাকে, তাদের শরীরের কোষ মরে যেয়ে কোন যায়গায় পচন ধরেনা কেন? কারণ, কোষগুলো তখন নিজ দেহের চর্বি খেয়ে (পুড়িয়ে) বেঁচে থাকে৷ যেহেতু তাদের দেয়ালও চর্বি দিয়ে তৈরী, তাই চর্বি কোষে প্রবেশ করতে কোন সমস্যাও হয়না! কিন্তু এক্ষেত্রে বিপদ হয় অন্য৷ শরীর ভেঙ্গে পড়তে থাকে, ওজন কমতে থাকে, ত্বকের কমনীয়তাও নষ্ট হয়ে যায় এবং রক্তে বিষাক্ত কেমিক্যাল জমতে থাকে!

আপনাকে একটা হোমওয়ার্ক দিই৷ গ্যাসের চুলার উপর এক টুকরা গরু বা খাশির চর্বি পোড়ান তো! দেখবেন, সারা বাড়ী উৎকট দূর্গন্ধে ভরে গেছে৷ কারণ চর্বি পোড়ালে বিষাক্ত কিছু কেমিক্যাল তৈরী হয়৷ সুতরাং উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস রোগী যাদের কোষগুলোকে, শরীরকে খেয়েই বেঁচে থাকতে হচ্ছে, তাদের রক্তে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত কেমিক্যালও জমা হচ্ছে… যা কখনো কখনো মানুষটিকে মৃত্যুর মুখোমুখিও নিয়ে যেতে পারে!

॥ ৫ ॥

আর রক্তের ওই অতিরিক্ত সুগার যা দীর্ঘসময় ধরে থাকলে, আমাদের সব ভাইটাল অর্গান যেমন, ব্রেন, কিডনী, চোঁখ, নার্ভ, হার্ট ইত্যাদি নষ্ট হয়ে যাবে, এই অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য ব্রেন কি কিছুই করেনা? হ্যাঁ করে৷ সেটা হলো, প্রস্রাব দিয়ে যতোটা পারা যায়, রক্তের সুগার বের করে দেয়৷ কিন্তু সুগার আবার পানিকে খুব ভালোবাসে৷ তাই একটি সুগার বের হয়ে যাবার সময় কয়েকটি পানিকেও সঙ্গে করে নিয়ে যায়৷ ফলে শরীরে পানির সংকট দেখা দেয়…. গলা শুকিয়ে যায়, রোগীর ঘন ঘন পিপাসা পায়! জটিল আকার ধারণ করলে, এই পানিশূন্যতা মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে!

॥ ৬ ॥

অন্য যেকোন রোগের চেয়ে, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা সম্পূর্ণ আলাদা৷ রোগীর বয়স, পেশা, ওজন, লিঙ্গ, জীবন ধারন পদ্ধতি, সামাজিক অবস্থান, খাদ্য অভ্যাস, অন্যান্য অসুখের উপস্থিতি ইত্যাদি বহু বিষয়ের উপর ডায়াবেটিসের সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে৷ এজন্যই একই ঔষধ বা ইনসুলিনের একই ডোজ, বিভিন্ন রোগীর শরীরে বিভিন্ন মাত্রার ফলাফল প্রদর্শন করে৷ আবার একই চিকিৎসা একই রোগীর ক্ষেত্রে, বেশীদিন একই ফলাফল বজায় রাখতেও পারেনা৷ সুতরাং নির্দিষ্ট সময় পরপর চিকিৎসা modify বা adjust করতে হয়!

॥ ৭ ॥

এবার আসি আমাদের দেশে, ডায়াবেটিসের প্রচলিত চিকিৎসা প্রসঙ্গে৷ একজন রোগী ২/৩ মাসে একবার ডায়াবেটিস সেন্টার গুলোতে যান এবং তাদের মাত্র ১ দিনের সকালের ১টি বা ২টি সুগারের মাত্রার উপর ভিত্তি করে, পরবর্তী ২/৩ মাসের চিকিৎসা দেয়া হয়৷ অনেক রোগীই এই রক্ত পরীক্ষা উপলক্ষে, তার আগের ২-৩ দিন খুব নিয়ম মেনে চলেন, বেশী হাঁটাহাটি করেন এবং খাবারেও নিয়ন্ত্রন আনেন — যেন রিপোর্ট ভালো আসে৷ আবার উল্টোটাও ঘটে — অনেকে পরীক্ষা করার দিন, ঔষধ খেতে ভুলে যান বা আনতে ভুলে যান বলে আর খান না৷ ফলে, ঔষধ বিহীন সেই ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই ঠিক হয় তাদের পরবর্তী চিকিৎসা! 

এখানে চিন্তা করার বিষয়গুলো হচ্ছেঃ

১) শুধু সকালে সুগার ভালো রেখে, দুপুরে এবং রাত্রে বেশী থাকলে — আপনার চিকিৎসা কতখানি সুফল বয়ে আনছে আপনার জন্য ? উপরের আলোচনার ভিত্তিতে একটু চিন্তা করুন!

২) নিজেকে ফাঁকি বা ডাক্তারকে ফাঁকি দেবার পরিণাম, কাকে ভোগ করতে হবে ?

৩) আপনার ডাক্তার কি আপনার সব দিক বিবেচনায় এনে আপনার চিকিৎসা দিচ্ছেন? যেমনঃ আপনার পেশা কি, আপনি কি জাতীয় খাবার খান, আপনি কিভাবে জীবন যাপন করেন, আপনার টেনশন কেমন, অন্য আর কি কি রোগে আপনি ভুগছেন — ইত্যাদি৷ এছাড়া, আপনার ২৪ ঘন্টা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে — উনি কি সচেতন ?

॥ ৮ ॥

আমি গত ১৪ বছর যাবৎ শুধু ডায়াবেটিস নিয়েই কাজ করেছি এবং অসীম কৌতূহল নিয়ে, বিভিন্ন রোগীর শরীরে ইনসুলিন / ঔষধের ফলাফল বিশ্লেষণ করেছি৷ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসে ভুগতে থাকা, অনেক জটিল রোগীদেরকেও — আল্লাহর রহমতে স্বাচ্ছন্দপূর্ণ জীবন উপহার দিতে পেরেছি৷ এছাড়া আমার রোগীদেরকে ডায়াবেটিসের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহও যত্নসহকারে শিখিয়েছি৷

কিন্তু আমার কাছে এখনো প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীই একেকটি রহস্য উপন্যাস … আর সেই রহস্য ভেদ করে, তাদেরকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারার আনন্দটা একেবারেই অন্যরকম… এই আনন্দই আমার বেঁচে থাকার অন্যরকম অনুপ্রেরণা!!!

“ডায়াবেটিস রাখুন নিয়ন্ত্রণে
সুস্থ থাকুন দেহ মনে!”

লেখকঃ

ডা. মোঃ এজাজ বারী চৌধুরী৷
MBBS (DMC), CCD (BIRDEM)
PGP in Diabetes (USA).
ডায়াবেটোলজিস্ট এবং হেড অব ডায়াবেটিস সেন্টার৷
মুন্নু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল৷

Please Share:

Related posts

Leave a Comment