ক্যান্সার বার্তা – ২ অধ্যাপক ডাঃ কাজী মুশতাক হোসেন

ক্যান্সার বার্তা অধ্যাপক ডাঃ কাজী মুশতাক হোসেন

 (ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ কাজী মুশতাক হোসেনের অনবদ্য লেখনীতে ক্যান্সার বিষয়ে নানা জানা অজানা তথ্য সমৃদ্ধ এক রচনা)

অহেতুক খরচঃ ক্যান্সার চিকিৎসায় অনেক খরচ বলে অনেক কথা হয়। তা বলুন তো কোথায় খরচ হয় না বা কম খরচ হয়। শায়েস্তা খার আমলে টাকায় ৮ মন চাল পাওয়া যেত বলে অনেক কথা আমরা শুনেছি কিন্তু সেই সময় কজনার হাতে টাকা ছিল। অত আগের কথা বলে লাভ নেই আমাদের ছোট বেলাতেও নৃপেন দা’র জয়কালী হোটেলে চার আনায় একটা রসগোল্লা পাওয়া যেত। তা এখন একটা রসগোল্লার দাম কত? এখান থেকে হিসাব করলেই খরচ কত হয় তা বুঝতে পারবেন। হাল আমলের পোলাপান তো ‘চার আনা’ই চেনে না। চিকিৎসার খরচও বেড়েছে। আগে পরীক্ষা নিরীক্ষার এত সুযোগ ছিল না। যন্ত্রপাতিও ছিল না। হালে বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় আমরা প্রকৃতির অনেক রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারছি । অসুখ বিসুখের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের অবদান অনেক। রোগ নির্নয় থেকে চিকিৎসা, সব যায়গায় আধুনিকতার ছাপ। মিশরের প্যাপিরাস পাতায় আর গ্রীকদের খাতায় লেখা কারকিনোমা থেকে আজকের কারসিনোমা বা ক্যান্সারের হাজারো ধরন ধারন আর নানান চিকিৎসা পদ্ধতি পরীক্ষা নিরীক্ষা আর নিরন্তর গবেষনার উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের অঞ্জনাকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত মেমোরিয়াল স্লোয়ান কেটারিং হাসপাতালে গেলাম। সেখানে আমাদের ঢাকার মেয়ে জুলফিয়া দোভাষীর কাজ করছেন, উনি বললেন ‘ভাই এরা এই হাসপাতালে কিভাবে এলো? আমরা এতদিন এদেশে থেকেও তো কোনদিন এখানে ঢুকতে পারিনি’ । অঞ্জনার কথা অন্যদিন হবে, আজ অন্য কথা।

ক্যান্সার ধরা পড়তেই আমাদের দেশে অনেক সময় লাগে। আমাদের দেশের সবগুলো জেলা শহরে এই রোগ নির্নয়ের জন্য হিস্টোপ্যাথলজী পরীক্ষার কোন সুযোগ নাই। এজন্য যেতে হবে বিভাগীয় শহরে বা যেখানে মেডিকেল কলেজ আছে। শুরু হলো যন্ত্রনা। রোগ ধরা পরার পর জানতে হবে এর বিস্তার। মানে এটা শরীরের অন্য কোন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে কিনা। এ জন্য বুক, পেটের সিটি স্ক্যান সহ প্রয়োজনে ‘পেট সিটি’ স্ক্যান করতে হবে। এভাবে রোগের স্টেজ নির্নয় করা হবে। এর পর চিকিৎসার সিদ্ধান্ত। ক্যান্সার চিকিৎসায় সার্জারী, রেডিওথেরাপী, কেমোথেরাপী, হরমোন থেরাপী, ইমিউন থেরাপী, টারগেটেড থেরাপী, জিন থেরাপী ইত্যাদি প্রয়োজন।

ক্ষেত্রভেদে একজন রোগীর এই সবগুলো চিকিৎসাই লাগতে পারে। যেকোন একটি পদ্ধতি প্রয়োগের আগে জানতে হবে আপনার এই চিকিৎসা নেবার মত শারীরিক ফিটনেস আছে কি না। মানে আপনি এই চিকিৎসা সহ্য করতে পারবেন কিনা। এজন্য আপনার হার্ট, ফুসফুস, লিভার কিডনি এবং রক্তের সেল গুলো ঠিকঠাক আছে কিনা দেখতে হবে। যদি কারও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাপানী বা অন্য কোন অসুখ থেকে থাকে তাহলে তাঁর জন্য বাড়তি সতর্কতা বা ব্যবস্থা নিতে হবে, তা সে পরীক্ষা নিরীক্ষা বা চিকিৎসা যাই হোক।এর পর চিকিৎসার প্রতিটি পর্যায়ে দেখতে হবে সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা, চিকিৎসায় রেসপন্স হচ্ছে কি না বা পার্শ্ব-প্রতিকৃয়া হচ্ছে কি না । এজন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা লাগবে। চিকিৎসা শেষে আপনি ফলো আপে থাকবেন। প্রথম দুবছর দু-তিন মাস পর পর পরীক্ষা, তারপর তিন বছর ছয় মাস পর পর, তারপর বছরে এক বার করে আজীবন। আর যদি এর মধ্যে আবার ক্যান্সার ফিরে আসে বা নতুন করে দেখা দেয় তাহলে প্রতিটি ধাপই আপনাকে অতিক্রম করতে হবে। প্রতিটা ধাপের খরচের হিসাব করুন। পেয়ে যাবেন , যারা বিদেশে গিয়েছেন চিকিৎসার জন্য তারা জানেন ঠিক এভাবেই চিকিৎসা হয়েছে। এর কোনটাই অহেতুক নয়। খরচ হীন কোন জীবন নাই।

লেখকঃ

অধ্যাপক ডাঃ কাজী মুশতাক হোসেন
বিভাগীয় প্রধান, রেডিওথেরাপী বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ।
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সোসাইটি অফ রেডিয়েশন অনকোলজিস্টস (বি এস আর ও)
সদস্য, কার্যকরী পরিষদ, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি (বি সি এস)
কাউন্সিলর, ফেডারেশন অফ এশিয়ান অর্গানাইজেশনস ফর রেডিয়েশন অনকোলজী (ফারো)।

 

 

Please Share:

Related posts

Leave a Comment