স্তন-ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি

ডা· পারভীন শাহিদা আখতার
অধ্যাপক, মেডিকেল অনকোলজি বিভাগ
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা

স্তন-ক্যান্সার নির্ণয় হওয়ার পরের সময়টা রোগী ও তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক রোগী ও তার পরিবার সহজে এ রোগ মেনে নিতে পারে না। এ ছাড়া রোগী নিজে ক্যান্সার রোগের ভয়ে ও শোকে এতই কাতর হয়ে থাকে যে তার নাওয়া-খাওয়া, ঘুম, স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রোগী মানসিক ও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়।

রোগীর প্রিয়জনকে তাই এ সময় কাছে কাছে থাকতে হবে ও সাহস দিতে হবে। রোগীকে সঠিক তথ্য দিতে হবে। সম্ভব হলে রোগীর সঙ্গে সব বিষয়ে আলোচনা করা উচিত, যাতে চিকিৎসা গ্রহণ করার জন্য রোগী শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারে।
এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারে পরিবারের অভিজ্ঞজন, সমাজকর্মী, নার্স, চিকিৎসক কিংবা ভুক্তভোগী যারা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবন যাপন করছে।
আক্রান্ত রোগী ও তার পরিবারের কয়েকটি তথ্য অবশ্যই জানা উচিতঃ
স্তন-ক্যান্সার একটি নিরাময়যোগ্য রোগ। এ রোগ যেকোনো পর্যায়ে শনাক্ত হলে, কোনো না কোনো চিকিৎসা দেওয়া যায়, জীবনকে দীর্ঘায়িত করা যায় এবং জীবনের মান বাড়ানো যায়।
কোন পর্যায়ে রোগ নির্ণয় হয়েছে, কী কী চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োজন ও চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার উপশম বা কমানোর উপায়, চিকিৎসার সময়কাল ও খরচ, চিকিৎসা-পরবর্তী যত্ন প্রভৃতি অবশ্যই জানতে হবে।
স্তন-ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়। যেমন রোগের পর্যায়, বয়স, শারীরিক অবস্থা, অন্য কোনো অসুখে আক্রান্ত কি না ইত্যাদি। স্তন-ক্যান্সারের প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতিগুলো হলো সার্জারি বা শল্যচিকিৎসা, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও হরমোনথেরাপি।

রেডিওথেরাপি কী
রেডিওথেরাপি হচ্ছে আয়ন প্রস্তুতকারী অদৃশ্য শক্তি যেমন এক্স-রে, গামা-রে, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন দিয়ে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা।
গামা-রে বা রশ্মির উৎস কোবাল্ট৬০ টেলিথেরাপি মেশিন এবং এক্স-রে, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন শক্তির উৎস লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন।
কোবাল্ট৬০ ও লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন দিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা করা হয়। এতে ঠান্ডা বা গরম কিছুই অনুভূত হয় না। ব্যথাও হয় না। অনেকটা এক্স-রে করানোর মতো।

রেডিওথেরাপি চিকিৎসাপদ্ধতি

রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট (রেডিওথেরাপি চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) রেডিওথেরাপি চিকিৎসার মূল দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এ চিকিৎসা আক্রান্ত স্থানে দেওয়া হয়। রেডিওথেরাপি মেশিন দিয়ে চিকিৎসার আগে সিমুলেটর মেশিনের সাহায্যে চিকিৎসার স্থান নির্ধêারণ করে চিহ্নিত করা হয়।

পরে মার্কার কলম দিয়ে চিকিৎসার স্থানে দাগ দেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ দাগ কোনোভাবেই মোছা যাবে না। কলমের এ দাগ সাময়িক। তবে তা মুছে গেলেও যাতে চিকিৎসার স্থান সহজেই চেনা যায়, সে জন্য চিকিৎসার সীমানায় টাট্টু (সুই ফুটিয়ে ও কালি দিয়ে যা করা হয়) করা হয়।
স্তন-ক্যান্সার অপারেশনের পর রেডিওথেরাপি চিকিৎসা (অ্যাডজুভেন্ট রেডিওথেরাপি) প্রতিদিন তিন-চারটি ধাপে দেওয়া হয়। প্রতিটি ধাপে চিকিৎসার সময় খুবই কম। মাত্র দুই-এক মিনিট বা তারও কম। তবে রেডিওথেরাপি চিকিৎসার প্রস্তুতিতে বেশ সময় লেগে যায়। একটি লম্বা সময় নিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা দেওয়া হয়। রেডিওথেরাপি চিকিৎসার মাত্রা (ডোজ) ২৫-৩০টি অংশে ভাগ করে দেওয়া হয়।
সপ্তাহে পাঁচ দিন করে পাঁচ-ছয় সপ্তাহ চিকিৎসা দিতে হয়। প্রয়োজনে রেডিওথেরাপি ডোজ বাড়িয়ে বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়।

মেশিনে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা

প্রথম দিন চিকিৎসা দিতে একটু দেরি হয়। কারণ, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট তাঁর দল নিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য রোগীকে পরিকল্পনা অনুযায়ী রেডিওথেরাপি মেশিনে সেট করে থাকেন। পরে রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট (রেডিওথেরাপি মেশিন যিনি চালনা করেন) পরামর্শপত্র অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। রেডিওথেরাপি চিকিৎসার সময় রোগীকে মেশিন রুমে একা থাকতে হয়।
ক্লোজসার্কিট মনিটরে কন্ট্রোল রুম থেকে টেকনোলজিস্ট ও অন্যরা তা পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুম থেকে রোগীর সঙ্গে কথাও বলা যায়। রেডিওথেরাপি চিকিৎসারত রোগীর শরীর থেকে অন্যের শরীরে রেডিওথেরাপি ছড়ায় না। তাই পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে এ চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া যায়। প্রতি সপ্তাহে রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট রোগীকে পরীক্ষা করে থাকেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও অন্যান্য পরীক্ষা করানো হয়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
রেডিওথেরাপি চিকিৎসা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অল্প দিনেই তা সেরে যায়।

ক্লান্তি লাগা
রেডিওথেরাপি চিকিৎসায় ক্লান্তি শুরু হয় চিকিৎসার দুই-তিন সপ্তাহ পর থেকে। এ চিকিৎসায় শরীরের ক্ষয়রোধে কিছুটা শক্তি ব্যয় হয়। চিকিৎসাকালে শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে একটু বেশি সময় বিশ্রাম নিলে, পুষ্টিকর খাবার খেলে, রাতে বেশি সময় ঘুমালে ক্লান্তি দূর হয়।

ত্বকের পরিবর্তন
রেডিওথেরাপি চিকিৎসা ত্বকের ওপর দিয়ে দিতে হয়। কখনো কখনো ত্বকে চুলকানো ভাব থাকে। চিকিৎসার তিন-চার সপ্তাহ পর সূর্যতাপে ত্বক পোড়ার মতো লাল হয়ে ওঠে।

রেডিওথেরাপি চিকিৎসার সময় ত্বকের যত্ন
চিকিৎসা-স্থানের আলাদা করে যত্ন নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসা-স্থানে কোনো ধরনের সাবান, লোশন, সুগন্ধি, ট্যালকম পাউডার, কসমেটিকস, ওষুধ বা অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে না। চিকিৎসা-স্থানের ত্বক ঘষামাজা করা যাবে না।
ত্বকে লেগে থাকে এমন কোনো ধরনের টেপ ব্যবহার করা যাবে না।
অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা কোনো কিছুই চিকিৎসার স্থানে ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি গরম পানি ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। গোসলে স্বাভাবিক অথবা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। গোসলের পর নরম কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে পানি শুকাতে হবে।
বগলের নিচে ও সংলগ্ন স্থানে শেভ করার জন্য ইলেকট্রিক শেভার বা রেজর ব্যবহার করা যেতে পারে; অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। তবে শেভিং লোশন কিংবা হেয়ার রিমুভাল ক্রিম ব্যবহার করা যাবে না।
প্রয়োজন না হলে রোদে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। বাইরে বের হওয়ার সময় শরীর ভালোভাবে ঢেকে নিতে হবে, যাতে চিকিৎসা-স্থান রোদে পুড়তে না পারে। রেডিওথেরাপি চিকিৎসাকালে ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরতে হবে।

অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

রেডিওথেরাপি চিকিৎসাকালে স্তন সামান্য স্কীত হয়ে উঠতে পারে। তাতে অল্প ব্যথা হতে পারে। অনেক সময় উপুড় হয়ে ঘুমাতে অসুবিধা হতে পারে।
তবে চিকিৎসার পর এ সমস্যা সেরে যায়। চিকিৎসা শেষ হওয়ার দীর্ঘদিন পরও (কয়েক মাস থেকে বছর) স্তনে সামান্য ব্যথা হতে পারে এবং আকারে কিছুটা ছোট বা বড় হতে পারে।

Please Share:

Related posts

Leave a Comment