শিশু যৌন নির্যাতনঃ কারণ ও করণীয় – সৈয়দা সালমা শাহীন

শিশু যৌন নির্যাতনঃ কারণ ও করণীয় – সৈয়দা সালমা শাহীন

যৌনতা শব্দটি যেন, একটি ট্যাবু শব্দ! অথচ; প্রত্যকে ব্যক্তির জীবনে যৌনতা অপরিহার্য একটি জৈবিক চাহিদা। সভ্য সমাজে; প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী নিজ নিজ গোত্র বা ধর্মীয় ও সামাজিক নিয়ম, রাষ্ট্র স্বীকৃত আইন অনুযায়ী, পরিবার গঠনের উদ্দেশ্যে, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, নিজ নিজ জৈবিক চাহিদা পূরণে পরস্পর সম্মত যৌন বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন প্রক্রিয়াকে বুঝায়। প্রধানত; প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষের মধ্যে সৃষ্ট শারীরিক সম্পর্ক “যৌনতা” নির্দেশ করে।

যৌন নির্যাতনঃ কোন এক ব্যক্তির ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে, অযাচিত ও অন্যায়ভাবে পীড়ন করলে, জোর করে যৌন সঙ্গম করলে বা অন্য কোন প্রকৃতির যৌন অনুপ্রবেশমূলক আক্রমনাত্মক আচরণকে ধর্ষণ বুঝায়। অপরাধী পীড়িত’কে শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যায়ভাবে চাপ প্রদান অথবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। এছাড়াও অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন- কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু) এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। “শিশু যৌন নির্যাতন” বর্তমান সময়ের ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি।।

                                                      সৈয়দা সালমা শাহীন

বাংলাদেশে পরিচালিত এক পরিসংখ্যানের তথ্য মতে; বাংলাদের ৫২% মেয়ে শিশু, ৪৮% ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার। এছাড়াও ৫০% মেয়ে শিশু জীবনে, কোন না কোন সময়ে, যৌন নির্যাতন ও হমলার শিকার হয়। জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে; প্রতি ১০% শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। যাদের দ্বারা শিশুরা যৌন  নির্যাতনের শিকার হয়ঃ ভয়ঙ্কর তথ্য হল; এদের মধ্যে

• ৬০% পরিবারের পরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা(প্রতি ১০ জন অপরাধীর মধ্যে ৬ জন পরিবারের পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়। যেমনঃ শিক্ষক, প্রতিবেশি, বন্ধু,),

• ত্রিশ% আত্বীয় ও স্বজনদের মধ্যমে(প্রতি ১০ জনে তিনজন এই শ্রেণীতে। যেমনঃ ভাই, বাবা, কাকা, নানা) এবং

• ১০% বাইরের লোকেদের আক্রমণে শিকার হয়(প্রতি ১০ জনে একজন অপরাধী বাইরের লোক হয়ে থাকে)।
উপরোক্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিশুরা প্রধানত পরিবারে আগত ব্যক্তিদের মাধ্যমে, দ্বিতীয়ত নিকট আত্মীয় বা স্বজনদের আক্রমণের শিকার হয়। এই তথ্য প্রমাণ করে, আমাদের শিশুরা পরিবার ও সমাজে কত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছে।

কারণঃ * ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে সৃষ্ট অপসংস্কৃতি চর্চা, * পশ্চাদগামী মনোভাব, * যৌনতা নিয়ে অনাবশ্যক নিষেধাজ্ঞা, * বিকৃত মনোসামাজিক শিক্ষণ(যৌনতা সম্পৃক্ত পুর্ব সংকার, * মূল্যবোধের অভাব(দুর্বল মূল্যবোধ, * সঠিক সামাজিক শিক্ষণের অভাব(যৌনতা সম্পৃক্ত সঠিক ধারণা বা সুস্পষ্ট জ্ঞানের অভাব), * অসুস্থ পারিবারিক বন্ধন, * দীর্ঘ দিনের যৌন বঞ্চনা, * অপরাধ প্রবণতা, * মাদকাসক্ত ব্যক্তি এবং যৌন অপরাধীদের চিহ্নিত করণে সমস্যা, অপরাধীর যথাযথ শাস্তি বিধানে শিথিলতা, জটিলতা থেকে এই ব্যাধির জন্ম ও বিস্তার। যৌন নির্যাতনকারী ব্যক্তি অসুস্থ ব্যক্তিত্ব। আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা ব্যক্তি্র অনৈতিক আক্রমণাত্মক আচরণের দ্বারা সংঘটিত “শিশু যৌন নির্যাতন ভয়াবহভাবে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে! এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়; ছেলেদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেশি মাত্রায় হয়ে থাকে। তবে নারীদের দ্বারাও শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

করনীয়ঃ শিশুদের সঠিকভাবে যৌনতার শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের।

* প্রত্যেক অভিভাবক; বিশেষ করে মা-বাবাকে শিশুকাল থেকে ছেলে বা মেয়ে শিশুদের কখনো খালি গায়ে না রেখে, সব সময় পোশাকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে,
* পোশাক পরিবর্তনের সময় শিশুকে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার রক্ষার শিক্ষা দেয়া, * শিশুকে যথা সম্ভব কোলে না’নেয়ার অভ্যাস করতে হবে, গাল টেপা, চুমু নেয়ার ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে,
* ৬ বছর বয়স থেকে শিশুকে নিজ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার শিক্ষা দেয়া, * শিশুর স্পর্শকাতর স্থানগুলো সম্পর্কে সচেতন করা, * আত্মমর্যাদা বোধ, * আত্মবিশ্বাসী এবং সাহসী করে তুলতে হবে,
* আবেগ নিয়ন্ত্রণ শিক্ষা দিতে হবে, সুন্দর মনের বিকাশে প্রেরণা দিতে হবে, * আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে, ক* পাঠ্যপুস্তকে যৌনতা বলতে কি বুঝায় এবং যৌন নির্যাতন কি এবিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়া,
* শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন শিক্ষার আলোচনা করতে হবে,
* যৌন নির্যাতন একধরণের সামাজিক অপরাধ এবং কেন সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে
* যৌন অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে, বিচারের আওতায় আনার মাধ্যমে শিশু যৌন নির্যাতন হ্রাস করা সম্ভব।

লেখকঃ সৈয়দা সালমা শাহীন
প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কাউন্সেরল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

Please Share:

Related posts

Leave a Comment