সিস্টিক ফাইব্রোসিস

 

সিস্টিক ফাইব্রোসিস একটি বংশগত রোগ যা প্রধানত শ্বসন ও পরিপাকতন্ত্রকে আক্রমণ করে। এটি একটি মারাত্মক জীবনঘাতী রোগ। যখন কোন দম্পতি উভয়েই সিস্টিক ফাইব্রোসিসের একটি করে জিন বহন করেন তখন তাদের সন্তানের মাঝে এই রোগ প্রকাশ পায়। সাধারনত বাবা-মার মাঝে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ইউরোপ, আমেরিকার শেতাঙ্গদের মাঝে  এর প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রধানত ফুসফুস, অগ্নাশয়, যকৃত, অন্ননালী, জননতন্ত্র এ রোগে আক্রান্ত হয়।

 

কীভাবে হয়?


 

মিউকাস বা শ্লেষ্মা একধরনের পিচ্ছিল তরল যা আমাদের দেহে উৎপন্ন হয়। শ্লেষ্মা আমাদের দেহের বিভিন্ন অঙ্গের নালীসমূহকে রাখে আর্দ্র এবং নানা জীবাণু থেকে মুক্ত।

 

সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত রোগীদের দেহে এই শ্লেষ্মা আরও অধিক ঘন হয়। এই বেশি ঘন শ্লেষ্মা তাদের শ্বাসনালীতে আটকে গিয়ে নালীকে জ্যাম করে রাখে, ফলে রোগ-জীবাণু বাসা বাধে এবং শুরু হয় শ্বাসতন্ত্রের মারাত্নক সংক্রমণ।

 


সিস্টিক ফাইব্রোসিসে মৃত্যুর মূল কারন বারবার শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন হওয়া। একসময় ফুফফুস তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে রোগীকে নিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে।

আমাদের অগ্নাশয়ের পাচকরসের রাস্তা বন্ধ করে সিস্টিক ফাইব্রোসিস দেহের বিপাকে বেশ ভালো বিঘ্ন ঘটায়। পাচক রসের অভাবে খাদ্য ঠিকমতো হজম হয় না আর তৈরি করে কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস ও প্রচুর মল।

আক্রান্ত পুরুষদের সন্তান দানে অক্ষমতা এই অসুখের আরেকটি ক্ষতিকর প্রভাব। মহিলাদের ক্ষেত্রেও গর্ভধারণে সমস্যা দেখা যায়।

 

 

 

রোগের লক্ষণসমূহ

 

জন্মের ২-৩ বছরের মধ্যেই সিস্টিক ফাইব্রোসিসের লক্ষনসমূহ প্রকাশ পেতে শুরু করে। অনেকের বেলায় আরও দেরিতে প্রকাশ পায়।

 

নবজাতকের ক্ষেত্রেঃ

 

  1. দেহের আকার ও ওজন কম হওয়া
  2. জন্মের ২-৩ দিনের মাঝে মল ত্যাগ না করা
  3. পেট ফুলে যাওয়া ও অতিরিক্ত কান্নাকাটি করা
  4. ঘামে লবণের পরিমাণ বেশি থাকা

 

 

শিশু-কিশোরদের মধ্যে আরও দেখা যায়ঃ

 

শ্বসনতন্ত্রঃ

 

  1. কাশি ও শ্বাসকষ্ট যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে
  2. ঘন কফ বা শ্লেষ্মা
  3. কাশির সাথে রক্ত যাওয়া
  4. নাক বন্ধ থাকা
  5. জ্বর
  6. বুকে ব্যথা
  7. বারবার নিউমোনিয়া হওয়া

 

 

পরিপাকতন্ত্রঃ

 

  1. বয়স অনুযায়ী বৃদ্ধি না হওয়া
  2. দুর্গন্ধময় ও পরিমানে বেশি মলত্যাগ করা
  3. কোষ্ঠকাঠিন্য
  4. অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন(flatulence)
  5. স্ফীত উদর

 

 

পরবর্তীতে আরও হতে পারেঃ

 

  1. অগ্নাশয়ে প্রদাহ(Pancreatitis)
  2. প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা(infertility)
  3. শ্বসনতন্ত্রের তীব্র প্রদাহ বা ইনফেকশন
  4. লিভার সিরোসিস
  5. গলব্লাডারে পাথর
  6. আর্থ্রাইটিস ও অস্থি ক্ষয়
  7. ডায়াবেটিস
Xray of chest in cystic fibrosis

 

চিকিৎসাঃ

 

  1. সিস্টিক ফাইব্রোসিসের ক্ষেত্রে যত দ্রুত রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা শুরু করা হবে ততই রোগীর আয়ু বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
  2. শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশনের জন্য মূল চিকিৎসা এন্টিবায়োটিক থেরাপি।
  3. পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ
  4. প্রচুর পানি পান
  5. ভিটামিন ট্যাবলেট গ্রহণ
  6. সপ্তাহে ২-৩ দিন হাল্কা ব্যায়াম
  7. কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য ইসবগুলের ভুসি ব্যবহার
  8. প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শে খাবারে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা ও অগ্নাশয়ের এনজাইম গ্রহণ করা।

 

 

 

উন্নত বিশ্বে আধুনিক চিকিৎসার সহায়তায় এখন এই রোগে আক্রান্তরা গড়ে ৩৭ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সকল সুবিধা না থাকায় গড় আয়ু আরও কম হয়।

 

যেহেতু সিস্টিক ফাইব্রোসিস এমন একটি অসুখ যা আমরা এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিরাময় করতে পারিনি তাই এর সাথে যুদ্ধ করে কিভাবে ভালো থাকা যায় সেটাই এই রোগের চিকিৎসার মূলমন্ত্র। আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবার পরিজনের এ বিষয়ে সচেতনতা ও রোগীর নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন দিতে পারে তাকে এই সুন্দর পৃথিবীতে অধিক সময় বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।

 

 

 

ডা. রায়হান কবীর খান

 

Please Share:

Related posts

Leave a Comment