চিকুনগুনিয়ার পরে জয়েন্ট ব্যথার সংগ্রাম

আপনি যদি চিকুনগুনিয়া জ্বর থেকে উদ্ধার পেয়ে থাকেন এবং আপনার জয়েন্টগুলোতে এখনো ক্রমাগত ব্যথা রয়ে যায়, তবে এটি চিকুনগুনিয়ার দির্ঘ মেয়াদি রেশ হতে পারে। এটি ‘পোস্ট ভাইরাল’ বা ভাইরাস জনিত প্রদাহ পরবর্তি আর্থ্রোপ্যাথি নামেও পরিচিত। যদিও এই সমস্যা এক সময় চলে যায়, তবুও রোগির জন্য এটা ভিতিকর বটে।

সাদা স্ট্রিপ অয়ালা এডিস মশার একটি ছোট্ট কামড়ের ফলে এই ভাইরাল প্রদাহ তৈরি হয় এবং ফলাফল হিসাবে জ্বর হয়, কয়েক সপ্তাহের জন্য রোগীকে বিছানায় আটকে থাকতে হয়। এই আর্টিকেলে আমরা চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে সৃষ্ট জয়েন্ট ব্যথা ও চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি।

চিকুনগুনিয়া জ্বর সেরে যাবার পর যে সমস্যা গুলো রয়ে যায়ঃ

  • জয়েন্টগুলোতে ব্যথা (এই সমস্যাই বেশি) – এটি বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।
  • দুর্বলতা অনুভব
  • অলস ভাব এবং ক্লান্তি

কেন এ ব্যাথা হয়?

ভাইরাস ইনফেকশন এর পাল্টা প্রতিরোধ হিসাবে শরীরের ইমিউন সিস্টেম (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) এর কার্জক্রম এর পার্শ ফলাফল হিসাবে এই জয়েন্ট পেইন হয়ে থাকে। রোগ সৃষ্টি কারি কোন জীবাণু, ভাইরাস, ব্যক্টেরিয়া ইত্যাদি আমাদের শরীরে আক্রমন করলে আমাদের ইমিউন সিস্টেম তা প্রতিরোধ করা শুরু করে এবং সেই জীবাণু বা ভাইরাস, ব্যক্টেরিয়া কে মেরে ফেলতে চায়। কিন্তু, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস এর বিরুদ্ধে কাজ করতে যেয়ে প্রায়শই আমাদের ইমিউন সিস্টেম চিকুনগুনিয়া ভাইরাস এর সাথে সাথে নিজেদের শরীরেরই কিছু কোষ কে শত্রু মনে করে আক্রমন করে বসে। আর এই ভুল আক্রমন যদি মাংশপেশি এবং জয়েন্ট এর কোষ এর উপর হয়, তখন আমাদের শরীরে এবং জয়েন্ট এ তীব্র ব্যথা তৈরি করে। শুধু ব্যথাই নয়, অনেক সময় হাঁটু, কুনুই, কবজি ইত্যাদি জয়েন্ট লক হয়ে জায়। ভাইরাস আক্রমনের ফলে সৃষ্ট এন্টিবডি এর কারনে অনেক সময় জয়েন্ট এর মাঝখানে যে কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি থাকে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জয়েন্ট ফুলে যায় এবং অঙ্গ সঞ্জালন ব্যহত হয়।

চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সাধারণত শরীরের বড় জয়েন্ট গুল যেমন হাঁটু, কুনুই, কবজি ইত্যাদি তে অবস্থান নেয় এবং মারা যাওয়ার সময় ভাইরাস এর ভেতরে থাকা বিভিন্য টক্সিক উপাদান জয়েন্ট এর ভেতরে ছড়িয়ে যায় ফলে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয় এবং জয়েন্ট জমে জাওয়ার মত অবস্থা হয়।

ব্যাথা থেকে সম্পূর্ণ পরিত্রাণ পেতে কত সময় লাগেঃ

চিকুনগুনিয়া পরবর্তি আর্থ্রাটিস তিন মাস পর্জন্ত কখনও বছর ব্যপি থেকে যাতে পারে। কিছু ঔষধ, প্রয়োজন মতে ফিজিওথেরাপি ব্যাথা মোকাবেলা এবং পুণরুদ্ধার সময় হ্রাসে কার্যকর। তবে সুস্থ খাদ্যাভাসের মাধ্যমে শরীরের দুর্বলতা হ্রাস করুন, দেখা গেছে সুস্থ জীবনযাপন করেন এমন ব্যক্তি অন্যদের তুলনায় দ্রুত সুস্থ্য হয়।

কিভাবে চিকুনগুনিয়া পরবর্তি ব্যথা মোকাবেলা করতে হয়?

চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিস শরীর কে খুব দুর্বল করে ফেলতে পারে এবং রোগীদের দৈহিক কার্যক্রমে অক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে। নিচের ব্যবস্থা গুলো আপনাকে ভাল রাখতে সাহায্য করবেঃ

ব্যাথা নিরাময় ঔষধঃ

  • যে কোন কোন ওষুধ সেবনের আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
  • প্রয়োজনে আপনার চিকিৎসক আপনার জন্য উপযুক্ত ব্যাথা নিরাময় ঔষধ প্রেস্ক্রাইব করবেন।
  • ব্যথা নিরাময় ঔষধের অতিরিক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার এড়িয়ে চলুন; কারন এটা আপনার কিডনি এবং যকৃতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতি করতে পারে।
  • ৩ সপ্তহের বেশি ব্যথা থাকলে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গ্রহণ করাই ভালো।

ফিজিওথেরাপিঃ
আপনার ফিজিওথেরাপিস্ট এর দেখিয়ে দেয়া উপায়ে আপনাকে নিচের কাজ গুল করতে হবেঃ

সকালে অন্তত দুবার ধীরে ধীরে আপনার সমস্ত জয়েন্ট দেখিয়ে দেয়া উপায়ে সঞ্চালন করাবেন একটি চেয়ারে বসুন এবং আপনার পা প্রসারিত করুন। এক পা এক পা দুই পায়ের উপর ভর দিয়ে দারান। কোমর উভয় দিকে হালকা ভাবে টুইস্ট করুন। ওজনী জিনিস বহন পরিহার করুন। ভারী ব্যায়াম করবেন না।

কোল্ড প্যাক এর ব্যবহারঃ
একটি কাপড়ে বা গামছার মধ্যে একটি ঠান্ডা প্যাক (ফার্মেসি তে কোল্ড প্যাক কিনতে পাওয়া যায়) অথবা কিছু বরফ কুচি পেচিয়ে নিয়ে প্রদাহের জায়গায় প্রয়োগ করুন। এতে কিছু ব্যথার উপশম হবে।

জয়েন্ট লক, বা শক্ত হয়ে গেলে ব্যথা কমানোর ঔষধ এর পাশাপাশি অবশ্যই একজন ফিজিওথেরাপিস্ট এর তত্ত্বাবধানে ফিজিওথেরাপি নিতে হবে।

 

লেখকঃ ওসমান, পোস্ট গ্রাড নিউরো রিহ্যাব (ইউ কে), পোস্ট গ্রাড অর্থপেডিক মেডিসিন; ই-মেইলঃ [email protected]

Leave a Comment