এইচবিএস এজি পজিটিভ যকৃতের সমস্যা

কেস হিস্ট্রি-১
শাহজাহান শিক্ষিত বেকার যুবক। চাচাতো ভাই মহীউদ্দিন সৌদি আরবে ১০ বছর ধরে চাকরি করছেন। মহীউদ্দিনের সহযোগিতায় সৌদি আরবে চাকরির জন্য ৭০ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন তিনি। ভিসার জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে রক্তের পরীক্ষায় এইচবিএসএজি (HBs Ag) ধরা পড়ে। এ কি নতুন কোনো রোগ? শাহজাহান এইচবিএস নেগেটিভ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। আবার রক্ত পরীক্ষা, কবিরাজের ওষুধ, পানি পড়া, তাবিজ-কবজ, আমের রস, যে যা বলছেন, তাই করছেন তিনি। কিন্তু না, এইচবিএস এজি কমছে না। হতাশ হয়ে ওঠেন এই ২৬ বছরের যুবক। ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মহাবিপদে পড়েন তিনি। কী করবেন বুঝতে পারেন না।

কেস হিস্ট্রি-২
তমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সহপাঠীদের সঙ্গে সন্ধানীতে রক্ত দিতে গিয়ে শনাক্ত হলো এইচবিএস পজিটিভ। তাই তাঁর রক্ত অন্য কারও জন্য সংগ্রহ করা হলো না। তমাল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। হেপাটাইটিস-বি সম্পর্কে অল্প কিছু জানেন তিনি। কীভাবে তাঁর শরীরে এ জীবাণু প্রবেশ করল? কী করবেন, কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে পরামর্শ করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

কেস হিস্ট্রি-৩
এহবুব সাহেবের ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। স্কুলের হেপাটাইটিস-বি টিকা গ্রহণ কর্মসূচির আওতায় মেয়েটির রক্ত পরীক্ষায় শনাক্ত হয় এইচবিএস এজি পজিটিভ।
যে কেস হিস্ট্রিগুলো বলা হলো, তার সম্মুখীন আমরা প্রতিনিয়তই হচ্ছি। এইচবিএস পজিটিভ বলতে কী বোঝায়, কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, কী তার চিকিৎসা ইত্যাদি নিয়ে আজকের উপস্থাপন।
এইচবিএস এজি বলতে কী বুঝায়?
এইচবিএস এজি-এর অর্থ হলো হেপাটাইটিস-বি সারফেস এন্টিজেন যা হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের দেহ থেকে নিঃসৃত হয়। শুধু হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হলেই রক্তের এইচবিএস এজি পরীক্ষা পজিটিভ হয়।
হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস কী?

যেভাবে শরীরে প্রবেশ করে
হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস প্রধানত রক্ত এবং বিভিন্ন দেহাংশের মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন :
 হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত রক্ত এবং রক্তের অন্যান্য উপাদান কোনো রোগী গ্রহণ করলে।
 হেপাটাইটিস-বি আক্রান্ত রোগীর ব্যবহূত সুচ, সিরিঞ্জ, রেজার, ক্ষুর, ব্রাশ ইত্যাদি কোনো সুস্থ ব্যক্তি ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস-বি সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
 বিভিন্ন হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দাঁতের চিকিৎসালয়, বিউটি পার্লার, সেলুনে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার না করলে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
 গর্ভবতী মা যদি হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে থাকে, তাহলে জন্মের সময় নবজাতকের হেপাটাইটিস-বি সংক্রমণের আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে।
 হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক থাকলে।
রোগের লক্ষণ ও গতি-প্রকৃতি
অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ ছাড়াই রক্তের এইচবিএস এজি পজিটিভ পাওয়া যায়। সাধারণত বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে, রক্তদানের উদ্দেশ্য স্ক্রিনের পরীক্ষা করতে গিয়ে বা হেপাটাইটিস-বি টিকা নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করতে গিয়ে এইচবিএস এজি শনাক্ত হয়। কোনো উপসর্গ না থাকলেও হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস লিভারে মৃদু ইনফেকশন চালিয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে লিভারের ক্ষতি করতে থাকে। তখন বলা হয় ক্রনিক হেপাটাইটিস বা দীর্ঘস্থায়ী ইনফেকশন।
পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিস এমনকি লিভার ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

চিকিৎসা
এইচবিএস পজিটিভ রোগীদের প্রধান জিজ্ঞাসা এটা কীভাবে নেগেটিভ করা যায়? কত দিন লাগবে নেগেটিভ হতে? এইচবিএস এজি নেগেটিভ হয় দুভাবে—চিকিৎসার মাধ্যমে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে। সাধারণত শতকরা ৯০ ভাগ রোগী হেপাটাইটিস-বি দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার পর (একিউট হেপাটাইটিস) সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে, বাকি শতকরা ১০ ভাগ রোগী সময়ের সঙ্গে হেপাটাইটিস-বি নেগেটিভ হয়। ক্ষেত্রবিশেষে শতকরা পাঁচ ভাগ রোগী এইচবিএস পজিটিভ মুক্ত হতে পারে না নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দ্বারা।
তাদের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস-বির চিকিৎসা দরকার। প্রচলিত চিকিৎসা দুই ধরনের, মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট অথবা ইন্টারফেরন ইনজেকশন। শতকরা ৩০-৬০ জন রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার সফলতা দেখা যায়। চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্য হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসটিকে নিষ্ক্রিয় রাখে যাতে লিভারের ক্ষয়ক্ষতি কম হয় এবং ভবিষ্যতে লিভার ক্যানসার বা সিরোসিসের ঝুঁকি হ্রাস করে।
সব হেপাটাইটিস-বি রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা এক রকম নয় এবং রোগীভেদে এর চিকিৎসার ধরন ও সময়কাল নিরূপণ করা হয়। চিকিৎসা শুরুর আগে রোগীর লিভারের কার্যকারিতা, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের প্রকার ও সক্রিয়তা, রোগীর শরীরের অন্যান্য ভাইরাস (যেমন হেপাটাইটিস-সি) বা অন্য রোগ আছে কি না ইত্যাদি বিবেচনায় আনতে হয়। প্রথমত রোগীর আর্থিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিকিৎসা ব্যয়বহুল, যদিও কিছু কিছু ওষুধ আমাদের দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। এইচবিএস পজিটিভ রোগী যাদের চিকিৎসা শুরু করা যায় না, তাদের নিয়মিতভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এ ছাড়া এইচবিএস এজি পজিটিভ রোগীর পরিবারের অন্য সদস্যদের রক্ত পরীক্ষা করে এইচবিএস এজি নেগেটিভ হলে হেপাটাইটিস-বি টিকা নিয়ে নেওয়া নিরাপদ। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, এইচবিএস এজি পজিটিভ হলে হেপাটাইটিস-বির টিকা কোনো উপকারে আসবে না।

প্রতিরোধের উপায়
আপনার সামাজিক সচেতনতাই হেপাটাইটিস-বির সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে। সাবধান হতে হবে—
 সব সময় ডিসপোজেবল সুচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করবেন
 অন্য কোনো ব্যক্তির রক্ত শরীরে চিকিৎসার জন্য গ্রহণ করতে হলে সঠিকভাবে পরীক্ষা করে নেবেন। পেশাদার রক্ত দাতাদের রক্ত পরিহার করে চলবেন।
 সেলুন বা বিউটি পার্লারে নাক-কান ফুটানোর ক্ষেত্রে, দাড়ি বা চুল কাটার সময় ব্যবহূত জিনিসপত্র সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে কি না খেয়াল করবেন।
 পরিবারে হেপাটাইটিস-বির রোগী থাকলে অন্যান্য সদস্যদের হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন নিতে হবে।
 দাঁতের চিকিৎসায় বা দাঁত তোলার ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি যথাযথ জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করছে কি না জেনে নেবেন।
 ব্যক্তিগত টুথব্রাশ, রেজার, নেইল কাটার ইত্যাদি অন্যকে ব্যবহার করতে মানা করবেন।
 অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এড়িয়ে চলতে হবে।
 হেপাটাইটিস-বি পজিটিভ মায়ের শিশুদের ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা দিয়ে নিতে হবে।

এইচ আফতাব রোজী
একটি স্বাভাবিক যকৃতের চিত্র গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ২১, ২০১০

Please Share:

Related posts

Leave a Comment