বাতব্যথায় চোখের সমস্যা

বাতরোগ হল হাঁড় এবং মাংসপেশী সম্পর্কিত। এর সাথে আবার চোখের সম্পর্ক কোথায়? ভাবতেই অবাক লাগছে তাই না? শরীরের এমন অনেক রোগ আছে যাতে চোখের সমস্যাও একটা প্রধান ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

যেসব বাতরোগে চোখের সমস্যা হয়ঃ

রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস-এতে সাধারণত হাড় এবং পায়ের ছোট জয়েন্টে প্রদাহ হয়, তার সাথে চোখের শুষ্কতা, স্ক্লেরাইটিস (চোখের সাদা অংশের প্রদাহ), কেরাটাইটিস (চোখের কর্ণিয়ার প্রদাহ) ইত্যাদি হতে পারে।

জুভেনাইল আরথ্রাইটিস হাঁটু এবং পায়ের গোড়ালিসহ ছোট বড় বিভিন্ন জয়েন্টে প্রদাহ সৃষ্টিকারী এই রোগ সাধারণত ১৬ বছরের কম ছেলে-মেয়েদের বেশি হয়। এতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চোখে ব্যথাযুক্ত প্রদাহ বা ইউভাইটিস হতে পারে।

এনকাইলোসিং স্পনডাইলাইটিস- মাজায় ব্যথা এবং প্রদাহ সৃষ্টিকারী এই রোগে শতকরা ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে চোখের সমস্যা হতে পারে। এতে চোখে ইউভাইটিস এবং স্ক্লেরাইটিস হতে পারে।

রিটার সিনড্রম- এই রোগে হাঁটু, পায়ের গোড়ালি, পায়ের আঙ্গুল ইত্যাদি অংশ হঠাৎ করে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। সাথে সাথে চোখের কনজাংকটিভা, সাদা স্কেরা, কর্ণিয়া, ইউভিয়া, দৃষ্টি স্নায়ু এমনকি রেটিনাতেও প্রদাহ হতে পারে।

চোখের সমস্যা কিভাবে বুঝবেন?

শুষ্ক চোখ- চোখে জ্বালাপোড়া, কচকচ করা, ময়লা জমা, চোখের পানি কমে যাওয়া ইত্যাদি চোখের শুষ্কতার লক্ষণ।

কর্ণিয়া ঘা- বাতরোগের সাথে সাথে কোন কোন ক্ষেত্রে চোখের কালোরাজাতে ঘা হতে পারে। চোখে ব্যথা হওয়া, পানি পড়া, আলোতে চোখ খুলতে না পারা ইত্যাদি কর্ণিয়া ঘা-এর লক্ষণ।

স্কেরাইটিস- চোখের সাদা অংশ হঠাৎ করে লাল হওয়া, প্রচন্ড ব্যথা করা, চোখ নাড়াতে অসুবিধা হওয়া এই রোগের লক্ষণ। বাতের ব্যথার সাথে সাথে আক্রান্ত চোখেও ব্যথা শুরু হয়।

ইউভাইটিস- চোখের ভেতরে রক্তনালী পূর্ণ স্তরের প্রদাহকে ইউভাইটিস বলা হয়। বাতরোগের সাথে সবচেয়ে কমন চোখের রোগ এটি। দুই চোখে প্রচন্ড ব্যথা হওয়া, চোখে লাল হওয়া, আলো সহ্য করতে না পারা ইত্যাদি এ রোগের লক্ষণ। এই রোগের কারণে কর্ণিয়ার পেছনে পূঁজ জমে এবং চোখের চাপ বেড়ে গিয়ে রোগী অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

করণীয় প্রথমত ডাক্তারের পরামর্শে বিভিন্ন পরীক্ষা যেমন রক্ত পরীক্ষা, জয়েন্ট এক্সরে করার মাধ্যমে বাতরোগের ধরন সনাক্ত করতে হবে। তারপর সেই রোগের উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে হবে। ডাক্তার সাধারণত ব্যথার ওষুধ ছাড়াও বিভিন্ন ডিজিজ মডিফাইং ওষুধ, ইমুনোসাপ্রেসর ওষুধ ইত্যাদি সেবনের পরামর্শ দেন। নিয়মিত এসব ওষুধ সেবনে রুগী অনেক আরামবোধ করেন। ডাক্তারের পরামর্শে কিছু প্রয়োজনীয় ব্যায়াম করা যেতে পারে।

বাতরোগ বাড়ার সাথে সাথে চোখে সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে চক্ষু চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। সময়মত চিকিৎসা শুরু করা না গেলে চোখের প্রদাহের কারণে চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। সাধারণত একসাথে দুই চোখ, আবার একটির পর আরেকটি আক্রান্ত হতে পারে। বাতরোগের চিকিৎসার সাথে সাথে আক্রান্ত চোখের চিকিৎসা জরুরি।

এট্টোপিন আই ড্রপ কর্ণিয়ার ঘা এবং ইউভাইটিস দুইটি রোগের কার্যকরী। স্টেরইড ড্রপ-এর নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহারে চোখের প্রদাহ অনেকাংশে কমে আসে। চোখের চাপ বেড়ে গেলে ডাক্তারের পরামর্শে এন্টিগস্নুকোমা ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে। চোখের প্রদাহের কারণে লেন্সে ছানি পড়তে পারে। এতে দৃষ্টি কমে যেতে পারে। আইড্রপ ব্যবহার করে চোখের প্রদাহ কমলে ছানি অপসারণ এবং কৃত্রিম লেন্স প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি অনেকাংশে ফিরে পাওয়া সম্ভব। বাতরোগের চিকিৎসায় যারা অনেকদিন ধরে স্টেরইড সেবন করেন তাদের চোখে ছানি এবং গস্নুকোমা রোগ হতে পারে। সুতরাং ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতিত অনিয়ন্ত্রিত স্টেরইড সেবন করা উচিত নয়।

**************************
ডাঃ শামস মোহাম্মদ নোমান
এম,বি,বিএস, ডি,সিও, এফ,সি,পি,এস(চক্ষু)
জুনিয়র কনসালটেন্ট, চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রঃ, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।[email protected]
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ মার্চ ২০০৯।

Related posts

Leave a Comment